Untitled Document
** সিরাজগঞ্জের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার ** লাকসামে গৃহবধুকে ধর্ষনের দায়ে এক যুবক গ্রেফতার ** প্রবাসীর স্ত্রীর গোসলের ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়ানোর ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ! ** চৌদ্দগ্রামে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে দুই গরু ব্যবসায়ী ** চৌদ্দগ্রামে গভীর রাতে মাটি ভরাট করে সরকারী জায়গা দখলের চেষ্টা ** বাগেরহাটের ৭ম শ্রেণির ছাত্রীকে গণধর্ষণ, গ্রেফতার ২ ** বড় ভাইকে গলা কেটে হত্যা, করল সৎভাই ** নিউজ টোয়েন্টিফোরের সাংবাদিকদের ওপর হামলা ** বেড়াতে গিয়ে স্কুলছাত্রী ধর্ষণ – যুবক আটক ** নোয়াখালীর সেনবাগে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ডাকাত নিহত ** কুমিল্লায় স্কুল ছাএীকে অপহরণকালে লাকসামে যুবক এক আটক ** সিংড়ায় স্কুল ছাত্রকে বলাৎকার এর অভিযোগ ** মোহাম্মদপুরের আতঙ্ক হাসু-কাসু বাহিনীর প্রধান আবুল হাসেম ওরফে হাসুকে গ্রেপ্তার ** কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে দুই মাদক ব্যবসায়ী নিহত ** পঁচিশে মার্চ একাত্তর- এক কালরাতের কাহিনী
Mar 252013
 

cuwP‡k gvP© GKvËi- GK Kvjiv‡Zi Kvwnbx২৫ মার্চ ১৯৭১ বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো রাত। ১৯৭১ সালের এই রাতে বাংলাদেশে ইতিহাসের বর্বরতম অধ্যায়ের শুরু হয়েছিল। কয়েক দিন আগে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী শামিমা ৪২ বছর আগে তার লেখা একটি ঐতিহাসিক চিঠির কপি আমাকে দিল।
শামিমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগে পড়া প্রথম মেয়ে। অনেক বড় বড় চাকরি করে বর্তমানে সে অবসরে। কয়েক দিন আগে মেয়ের বিয়ে দিল। এখন আমার পড়শি। শামিমা চিঠিটা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তার বড় বোনকে লিখেছিল পাবনা থেকে। পোস্ট করা হয়নি। সম্প্রতি সে তার পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে সেটা আবিষ্কার করেছে। তার মনে হয়েছে, আমি যেহেতু পত্রপত্রিকায় লিখি, তা আমাকে দিলে সেটি কাজে লাগবে। তার কাছে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল আছে বলে সে আমাকে জানিয়েছে। তার চিঠির অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরছি, যাতে বর্তমান প্রজন্ম বুঝতে পারে, কেমন ছিল ২৫ মার্চের ও তার পূর্ববর্তী সময়ের বাংলাদেশ।
শামিমা তার বড় বোন আর দুলাভাইকে লিখছে, ‘অনেকদিন তোমাদের লিখিনি। পরীক্ষা ছিল তাই লেখা হয়নি (অনার্স ফাইনাল)। শুরু হয়েছিল ১৮ জানুয়ারি, ১৯৭১ সনে-শেষ হওয়ার কথা ছিল ৬ মার্চ ‘৭১। দেশের অবস্থা তোমরা নিশ্চয় ঠড়রপব ড়ভ অসবৎরপধ (ভয়েস অব আমেরিকা) থেকে জেনেছো, তাই পরীক্ষা বন্ধ হয়। এখনও ৭ঃয ্ ৮ঃয ঢ়ধঢ়বৎ এবং ঠরাধ-ঠড়পব বাদ আছে।
১ংঃ গধৎপয-এ যখন ইয়াহিয়া ১টা ৫ মিনিটে রেডিওতে ঘোষণা করলেন ৩ৎফ ড়ভ গধৎপয-এ ঘধঃরড়হধষ অংংবসনষু বসবে না এবং এটা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগতি হলো, তুমি না দেখলে বিশ্বাস করবে না, কেমন করে কোথা থেকে এত তাড়াতাড়ি ঢাকার পথে সব লোকজন বেরিয়ে এলো। নানা ধরনের ংষড়মধহ দিতে লাগল। মনে হলো যেন রিঃযরহ ধ ংবপড়হফ সব লোকজন বেরিয়ে পড়ল। ওরা সবাই বিক্ষুব্ধ। সারা প্রদেশের মানুষ কিভাবে এমন জেগে উঠল, সেটা কথায় শেষ করা যাবে না। তোমাকে বলব কি করে এ অবস্থার কথা।ৃতারপর এলো ৭ মার্চ শেখ মুজিব রেসকোর্সের ময়দানে ঘোষণা করলেন, ‘আমাদের (পূর্ব পাকিস্তান এখন এটাকে বলা হবে বাংলাদেশ) দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা হবীঃ কোনো ঘধঃরড়হধষ অংংবসনষুতে যোগ দেব না।’ ৃএর মধ্যে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা পোড়ানো হলো। তার পরিবর্তে বাংলাদেশের পতাকা করা হলো। সেটা হলো ঘন সবুজের মধ্যে লাল গোলক, তার মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্র। লালটা সংগ্রামের প্রতীক (এখানে শামিমা তার বোন-দুলাভাইকে বোঝানোর জন্য ছোট করে বাংলাদেশের একটি পতাকা এঁকে দিয়েছে)। ৃ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস ছিল। এটা ছুটির দিন ছিল। মুজিবের কথা মতো পুরো বাংলাদেশে বাংলাদেশের পতাকা ওঠানো হয়।
৭ মার্চের পর থেকে অসহযোগ আন্দোলন। হরতাল চলছে অনেক দিন। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত বন্ধ। আজকে ঘধঃরড়হধষ অংংবসনষু বসার কথা ছিল। সেটা স্থগিত রাখা হলো। মুজিব বললেন, আমাদের দাবি না হওয়া পর্যন্ত ঘ.অ.তে উনি যোগ দেবেন না। এটা তো জানোই, গঁলরন ঝরহমষব গধলড়ৎরঃু ভোট পেয়েছেন। ওহো, ৭ মার্চের পর থেকে আজও আমরা বাংলাদেশের সবাই কালো পতাকা তুলে বসে আছি। এর মধ্যে এড়াবৎহড়ৎ অযংধহকে সরিয়ে দিয়ে আরেকজনকে এই পদে নিযুক্ত করা হলো। আহসান কিন্তু খুব ভালো লোক ছিলেন। থাক। ঞরশশধ কযধহকে পাঠানো হলো। আমাদের বিচারপতি (বি এ সিদ্দিকী) ওনার ড়ধঃয নিলেন (দিলেন) না। কত বড় অপমান চিন্তা ৃভেবে দেখ। ৃ..আমি ৯ মার্চ বাড়ি এসেছি। জানি না কবে ঢাকা যাব।” (বন্ধনীর ভেতরের শব্দ/বাক্যগুলো আমার। যেহেতু এটি ব্যক্তিগত চিঠি কিছু ভুলত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। মূল চিঠির কোনো কিছু পরিবর্তন করা হয়নি।) চিঠিটা এ জন্যই পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করলাম, যাতে পাঠক মফস্বল থেকে আসা একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর জবানিতে ২৫ মার্চের আগের দিনগুলো সম্পর্কে সামান্য ধারণা পেতে পারেন। শামিমা কোনো ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল না। খুব পড়ুয়া ছাত্রী ছিল। আমাদের অনুষদের একমাত্র ও প্রথম ছাত্রী হওয়ায় সবাই তাকে বেশ আদর করত।
১৯৭১-এর ১ মার্চ রেডিও পাকিস্তানে প্রচারিত ইয়াহিয়া খানের ঘোষণার পরপরই খুব দ্রুত বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসন বঙ্গবন্ধুর হাতে চলে যায়। সমসাময়িক ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত কমই আছে যে একজন বেসামরিক ব্যক্তি, যাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক বা আইনগত ক্ষমতা নেই, তাঁর নির্দেশে দেশের পুরো বেসামরিক প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। ইয়াহিয়া খান ঠিকই বুঝেছিলেন পাকিস্তানকে রক্ষা করতে হলে তাঁকে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে হবে। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে এটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন- ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া ঢাকা আসেন। তার আগে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে একাধিক রাজনৈতিক নেতা ও জাতীয় সংসদ সদস্য ঢাকা এসে গিয়েছিলেন। ২১ তারিখ পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আসেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল গুল হাসান তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে তাঁর অবস্থান থেকে নড়ানোর অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু মুজিব তাঁর অবস্থানে (৭ মার্চের) অটল থাকেন। তিনি কোনো ধরনের আপস করতে রাজি ছিলেন না। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইয়াহিয়া অন্য রাজনীতিবিদদের কাছে জানতে চান তাঁর (ইয়াহিয়া) করণীয় কী হওয়া উচিত। তাঁরা সবাই বলেন, যেহেতু তিনি রাষ্ট্রপ্রধান বিচার-বিবেচনা করে তাঁকেই সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে হবে। একমাত্র ভুট্টোর বক্তব্য ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। ভুট্টো ইয়াহিয়াকে জানালেন, একমাত্র দ্রুত সামরিক হস্তক্ষেপই মুজিবকে শায়েস্তা করতে পারে। এরপর ইয়াহিয়া তাঁর উপদেষ্টা জেনারেল পীরজাদা ও জেনারেল হামিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তাঁরাও ভুট্টোর মতের সঙ্গে সুর মেলান। জেনারেল গুল হাসান লিখছেন, ‘সবাই মিলে পাকিস্তানের কফিন বাক্সে শেষ পেরেকটা ঠুকে দিল।’
২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতারা বুঝে যান পকিস্তানি সামরিক শাসক অথবা সরকারের সঙ্গে তাঁদের আলোচনার আর কিছুই নেই। ২৪ তারিখ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে বলেন, তাঁদের আর কিছু বলার নেই এবং আর কোনো আলোচনারও প্রয়োজন নেই। এর মধ্যে ভুট্টো ছাড়া পাকিস্তান থেকে আসা প্রায় সব রাজনৈতিক নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে দেখা করেন। তাঁরা ইয়াহিয়াকে এও বোঝাতে ব্যর্থ হন যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবের কাছেই অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করা উচিত। জেনারেল পীরজাদা পরে বলেছেন, ‘১৫ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত ইয়াহিয়া শুধু যে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন তাই নয়, তিনি তাঁর সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গেও নিয়মিত শলাপরামর্শ করেছেন এবং একই সঙ্গে জাহাজ বোঝাই করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র আর সেনা সদস্যদের বাংলাদেশে আনা শুরু করেছিলেন।’ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়ার আলোচনার পুরোটাই ছিল ভাঁওতাবাজি।
২৫ মার্চ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সেনাবাহিনীর গুলিতে কমপক্ষে ১১০ জন নিহত হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজ থেকে বাঙালি শ্রমিকরা অস্ত্র খালাস করতে অস্বীকার করলে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি করা হয়। পরে বাঙালি অফিসার মেজর জিয়ার নেতৃত্বে সে অস্ত্র খালাসের জন্য অন্য আরেকটি সেনা দলকে সেখানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ২৭ মার্চ সারা দেশে হরতাল আহ্বান করেন। ২৬ মার্চ বাংলাদেশে আগের রাতের বাঙালি নিধনের নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়নের কারণে ঢাকা থেকে কোনো পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি। তবে বঙ্গবন্ধুর এই বিবৃতিটি করাচির ডন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হলে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের দায়িত্ব দিয়ে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে দ্বিতীয় কমান্ড ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেড এ খানকে ২৩ মার্চ ঢাকা আনা হয়। তিনি তাঁর গ্রন্থ ঞযব ধিু রঃ ধিং-এ লিখেছেন, ‘আমি ২৩ তারিখ ঢাকায় এসে সেনানিবাস ছাড়া কোথাও পাকিস্তানি পতাকা দেখিনি, যদিও দিনটি ছিল পাকিস্তান দিবস।’ ইতিমধ্যে সেনাবাহিনী ধানমণ্ডি এলাকার একটি মডেল তৈরি করে ফেলেছিল, যেখানে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়ি চিহ্নিত ছিল। ব্রিগেডিয়ার খান সেনানিবাস ছাড়াও তার আশপাশে, তেজগাঁও বিমানবন্দরে সেনাবাহিনীর সাজ সাজ রব দেখতে পান। এরই মধ্যে অনেক সেনানিবাসে বাঙালি সেনা সদস্যদের তাদের অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল, যা প্রায় সবাই অমান্য করেছিল।
২৫ মার্চ রাতে ঢাকা শহরে এক ধরনের থমথমে অবস্থা বিরাজ করে। এটি সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে সামরিক অভিযান সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে তা কত ভয়াবহ হতে পারে, সে সম্পর্কে কারো কোনো ধারণা ছিল না। জনগণ সেনানিবাসের আসা-যাওয়ার সব পথে ব্যারিকেড বসায়। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে শুধু বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে ভেসে আসে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু জানতে পারেন, ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেছেন। তিনি তাঁর দলীয় নেতা-কর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলেন। শেখ হাসিনা, তাঁর স্বামী ড. ওয়াজেদ আর শেখ রেহানাকে তিনি ৩২ নম্বরের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বলেন। দলীয় নেতারা বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন তাঁদের সঙ্গে চলে আসেন। তিনি বলেন, কোনো অবস্থায়ই তিনি বাড়ি ত্যাগ করবেন না। তিনি পালিয়ে গেলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁর খোঁজে ঢাকা শহরের কোনো মানুষকে জীবিত রাখবে না।
রাত ১২টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, যা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর সিদ্দিক সালেক তাঁর গ্রন্থ ডরঃহবংং ঃড় ঝঁৎৎবহফবৎ-এ উল্লেখ করেছেন। রাত ১১টার পরপরই পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তাদের সাঁজোয়া বহর, ট্যাংক, কামান ও অন্যান্য আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সেনানিবাস ও তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে পড়ে। পাথর-ব্যারিকেড সরিয়ে রাতের অন্ধকারকে ভয়ংকরভাবে আলোকিত করে পুরো শক্তি নিয়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরই মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেড এ খানের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সম্পর্কে সিদ্দিক সালিক তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মুজিব যখন আদমজী স্কুলে বিশ্রাম নিচ্ছেন, তখন ঢাকা শহর গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। বারান্দা থেকে আমি চার ঘণ্টা ধরে ভয়াবহ এ দৃশ্য দেখলাম। এই রক্তাক্ত রাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল আকাশে গুলিবর্ষণ করে আগুন সৃষ্টি করা। চাঁদের আলো ও নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা মানুষের সৃষ্ট অগ্নিকুণ্ডের কাছে ম্লান হয়ে যায়। সবচেয়ে লম্বা ধোঁয়া ও অগ্নিকুণ্ডলী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দেখা যায়।’
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক জান্তার প্রধান টার্গেট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; কারণ তারা মনে করত, পাকিস্তান সরকারের সব অবৈধ কাজের প্রথম প্রতিরোধ শুরু হয় এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পাকিস্তানি সেনাদের প্রধান তিনটি কলাম যাত্রা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আর তৎকালীন পিলখানার ইপিআর ক্যাম্পের দিকে। যাওয়ার পথে তারা রাস্তার উভয় পাশের সব বাড়িঘর, বস্তি, দোকানপাট কামানের গোলা দিয়ে উড়িয়ে দেয়। আক্রমণকারীরা জহুরুল হক হল ও জগন্নাথ হলে কিছু বাধার সম্মুখীন হলেও তা ছিল তাদের ট্যাংক-কামানের সামনে নিতান্তই অপ্রতুল। সে রাতে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল, জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল ছাড়াও হামলা করে শিক্ষকদের কোয়ার্টারে। প্রথম রাতেই হত্যা করা হয় কমপক্ষে ৯ জন সিনিয়র শিক্ষককে। অসংখ্য নিরস্ত্র ছাত্র নির্মমভাবে নিহত হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পুলিশ ও পিলখানার ইপিআর বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা তাঁদের পুরনো ব্রিটিশ আমলের ৩০৩ রাইফেল দিয়ে একটি প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তাঁরা শেষ বুলেট পর্যন্ত লড়াই করে যান। সে এক অসাধারণ দেশপ্রেমের বীরত্বগাথা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।
২৫ তারিখ রাতে পৃথক বিমানে ভুট্টো করাচি ফিরে গিয়েছিলেন। ফিরে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মুজিব কোনো কিছুতেই আপসে রাজি ছিলেন না। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানান যে তারা পাকিস্তানকে রক্ষা করেছে। সে রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু করার আগে সব বিদেশি সাংবাদিককে তাঁদের হোটেল থেকে তুলে নিয়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরের কাছে একটি বাড়িতে আটকে রেখেছিল। পরদিন সকালে সবাইকে বিমানে তুলে করাচি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী চায়নি বিশ্ব জানুক বাংলাদেশে কী ধরনের গণহত্যা হচ্ছে। দুজন বিদেশি সাংবাদিক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে লুকিয়ে থাকতে পেরেছিলেন। তাঁরা হলেন এপির আলোকচিত্রী মিশেল লরেন্ট আর অন্যজন লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফের সায়মন ড্রিং। ড্রিং কয়েক দিন পর লন্ডন থেকে প্রকাশিত টেলিগ্রাফে লেখেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রথম টার্গেট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, তারপর ঢাকার হিন্দু বাসিন্দারা। তারা মানুষকে ঘরের বাইরে আসতে বাধ্য করত তারপর তাদের গুলি করে হত্যা করত। ২৬ তারিখ ভোরের দিকে গুলি বন্ধ হয়। তখন ঢাকা জ্বলছিল। দুপুরের দিকে তারা পুরনো ঢাকার দিকে অগ্রসর হয় এবং পরবর্তী ১১ ঘণ্টা সেখানে তাদের এই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চলতে থাকে।’ ২৫ তারিখ রাতে ঠিক কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তার কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া মুশকিল। তবে ওই এক রাতে ঢাকাসহ সারা দেশে কমপক্ষে এক লাখ মানুষকে হত্যা করা হয় বলে অনেক গবেষক জানিয়েছেন। কোনো একটি জাতিকে যদি স্বাধীনতার জন্য কোনো মূল্য দিতে হয়, তাহলে বাঙালির চেয়ে অন্য কোনো জাতি এত চড়া মূল্য দেয়নি। ইতিহাস তার সাক্ষী। বঙ্গবন্ধু ২৫ তারিখ সন্ধ্যার পর তাঁর অনেক ঘনিষ্ঠজনকে বলেছিলেন, ‘দেশটাকে স্বাধীন করে দিলাম। এখন এটাকে রক্ষা করা তোমাদের দায়িত্ব।’ স্বাধীনতা পাওয়ার চেয়ে তা রক্ষা করা অনেক সময় কঠিন। ২০১৩-এর বাংলাদেশে তা আরো বড় সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 Posted by at 7:55 am

 Leave a Reply

(required)

(required)

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>